মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৬

উযাইর আলাইহিস সালাম এর ঘটনা


উযাইর আলাইহিস সালাম এর ঘটনা


প্রশ্ন: আমি উযাইর আলাইহিস সালাম এর ঘটনা জানতে চাই। তাঁর ক্ষেত্রে আলাইহিস সালাম বলা কি ঠিক হবে? তিনিই কি সে ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তাআলা একশ বছরের জন্য মৃত্যু দিয়ে আবার পুনর্জীবিত করেছেন; যেমনটি সূরা বাকারাতে উদ্ধৃত হয়েছে?

উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ।
এক:
‘উযাইর’ বনী ইসরাইলের একজন নেককার ব্যক্তি। তিনি নবী কিনা- তা সাব্যস্ত হয়নি। যদিও প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে- তিনি নবী। ইবনে কাছীর ‘বিদায়া নিহায়া’ গ্রন্থে (২/২৮৯) এটাই ব্যক্ত করেছেন।
সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আমি জানি না- তুব্বা কি লানতপ্রাপ্ত; নাকি নয়। আমি জানি না- উযাইর কি নবী; না কি নবী নয়।” [আলবানি হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন]
শাইখ আব্বাদ বলেন:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা বলেছেন তাদের (তুব্বা সম্প্রদায়) অবস্থা জানার আগে। যেহেতু এ মর্মে রেওয়ায়েত এসেছে যে, তুব্বা সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করেছে। সুতরাং তারা লানতপ্রাপ্ত নয়। পক্ষান্তরে, উযাইর নবী কিনা এ ব্যাপারে কোন রেওয়ায়েত আসেনি।[শরহে আবু দাউদ (২৬/৪৬৮) থেকে সমাপ্ত]
তবে তাঁর ক্ষেত্রে ‘আলাইহিস সালাম’ বলতে কোন সমস্যা নেই। যেহেতু তিনি নেককার মানুষ ছিলেন। তাঁর ঘটনা কুরআনে এসেছে। আলেমদের অনেকে তাঁকে নবী হিসেবে গণ্য করেছেন।
আরও জানতে 152887 নং প্রশ্নোত্তর দেখুন।
দুই:
আল্লাহ তাআলা বলেন: “অথবা সে ব্যক্তির মত, যে এমন এক জনপদ অতিক্রম করছিল যা তার ছাদের উপর থেকে বিধ্বস্ত ছিল। সে বলল, মৃত্যুর পর কিভাবে আল্লাহ একে পুনর্জীবিত করবেন? অতঃপর আল্লাহ তাকে একশ বছর মৃত অবস্থায় রাখলেন। তারপর তাকে পুনর্জীবিত করলেন। আল্লাহ বললেন, ‘তুমি কতকাল এভাবে ছিলে?’ সে বলল, একদিন বা একদিনেরও কিছু কম সময়। তিনি বললেন, বরং তুমি একশত বছর অবস্থান করেছ। এবার চেয়ে দেখ নিজের খাবার ও পানীয়ের দিকে সেগুলো অবিকৃত রয়েছে এবং দেখ নিজের গাধাটির দিকে। আমি তোমাকে মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বানাতে চেয়েছি। হাড়গুলোর দিকে চেয়ে দেখ, আমি কিভাবে সেগুলোকে সংযুক্ত করি এবং গোশত দ্বারা ঢেকে দেই। অতঃপর যখন তার নিকট স্পষ্ট হলো তখন সে বলে উঠল- ‘আমি জানি, নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান’।[সূরা বাকারা, আয়াত: ২৫৯]
প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী এই ব্যক্তি হচ্ছেন- উযাইর। ইবনে জারির ও ইবনে আবু হাতিম ইবনে আব্বাস, হাসান, কাতাদা, সুদ্দি ও সুলাইমান বিন বুরাইদা থেকে এ অভিমতটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে কাছির বলেন: এই উক্তিটি প্রসিদ্ধ।[তাফসিরে ইবনে কাছির (১/৬৮৭) থেকে সমাপ্ত]
এ সংক্রান্ত মতভেদ জানতে দেখুন ইবনুল জাওযি (১/২৩৩) এর ‘যাদুল মাসির’।
‘বুখতানাসসার’ নামক ব্যক্তি উল্লেখিত গ্রামটিকে ধ্বংস করে ফেলার পর ও গ্রামবাসীকে হত্যা করার পর উযাইর সে গ্রাম দিয়ে -প্রসিদ্ধ মতে সেটি বাইতুল মুকাদ্দাস- অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। তখন সে গ্রামটি ছিল বিরান; তাতে কেউ ছিল না। এ গ্রামটি জনবহুল থাকার পর এখন এর যে অবস্থা তা নিয়ে তিনি ভাবতে ভাবতে বললেন: “মৃত্যুর (ধ্বংসের) পর কিভাবে আল্লাহ একে পুনর্জীবিত করবেন?” ধ্বংস ও বিরানতার ভয়াবহতা এবং পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসাকে দুরহ দেখে তিনি এ কথা বলেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: “অতঃপর আল্লাহ তাকে একশ বছর মৃত অবস্থায় রাখলেন।” এর মধ্যে শহরটি আবার পুনর্জীবিত হয়ে উঠেছে, লোকে লোকারণ্য হয়েছে, বনী ইসরাইলগণ এ শহরে ফিরে এসেছে। এরপর আল্লাহ যখন তাকে পুনর্জীবিত করলেন তখন সর্বপ্রথম তার চোখ দুইটিকে জীবিত করলেন যাতে করে সে আল্লাহর সৃজন ক্ষমতাকে দেখতে পায়, কিভাবে আল্লাহ তার দেহকে পুনর্জীবিত করেন। যখন তার গঠন পূর্ণ হল তখন আল্লাহ তাকে বললেন -অর্থাৎ ফেরেশতার মাধ্যমে- ‘তুমি কতকাল এভাবে ছিলে?’ সে বলল, একদিন বা একদিনেরও কিছু কম সময়। তাফসিরকারগণ বলেন: যেহেতু সে মারা গিয়েছিল দিনের প্রথমাংশে; আর তাকে পুনর্জীবিত করা হয়েছে দিনের শেষাংশে। যখন সে দেখল এখনো সূর্য আছে সে ভেবেছে এটি সে দিনেরই সূর্য। তাই সে বলেছে: “একদিনেরও কিছু কম সময়”  “তিনি বললেন, বরং তুমি একশত বছর অবস্থান করেছ। এবার চেয়ে দেখ নিজের খাবার ও পানীয়ের দিকে সেগুলো অবিকৃত রয়েছে”। বর্ণিত আছে তার সাথে আঙ্গুর, ত্বীন ফল ও শরবত ছিল। সে এগুলোকে যেমন রেখে মারা গিয়েছিল ঠিক তেমনি পেল। কোন পরিবর্তন হয়নি। শরবত নষ্ট হয়নি, আঙ্গুর পচেনি, ত্বীন গন্ধ হয়নি। “এবং দেখ নিজের গাধাটির দিকে”। অর্থাৎ তাকিয়ে দেখ তোমার চোখের সামনে আল্লাহ কিভাবে সেটিকে পুনর্জীবিত করেন। “আমি তোমাকে মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বানাতে চেয়েছি”। অর্থাৎ পুনর্জীবিত করার পক্ষে প্রমাণ বানাতে চেয়েছি। “হাড়গুলোর দিকে চেয়ে দেখ, আমি কিভাবে সেগুলোকে সংযুক্ত করি” অর্থাৎ একটি হাড্ডির সাথে অন্য হাড্ডিটি জুড়ে দেই। প্রত্যেকটি হাড্ডিকে স্ব স্থানে স্থাপন করে একটি ঘোড়ার কংকাল বানান; তাতে কোন গোশত ছিল না। এরপর এ হাড্ডির উপর গোশত, স্নায়ু, রগ ও চামড়া পরিয়ে দেন। এ সবকিছু করেছেন উযাইর এর চোখের সামনে। এভাবে যখন তার সামনে সবকিছু পরিষ্কার হলো তখন সে বলে উঠল- ‘আমি জানি, নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান’। অর্থাৎ এটি জানি। আমি তা সচক্ষে দেখেছি। আমার যামানার লোকদের মধ্যে আমি এ বিষয়ে সবচেয়ে ভাল জানি।[দেখুন: তাফসিরে ইবনে কাছির (১/৬৮৭-৬৮৯)]
আরও জানতে দেখুন 12350 নং ও 132236 নং প্রশ্নোত্তর।
আল্লাহই ভাল জানেন।







পাহাড়ের গুহায় আঁটকে পড়া তিন যুবক

পাহাড়ের গুহায় আঁটকে পড়া তিন যুবক
একবার তিনজন লোক পথ চলছিল, এমন সময় তারা বৃষ্টিতে আক্রান্ত হ’ল। অতঃপর তারা এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল। হঠাৎ পাহাড় হ’তে এক খণ্ড পাথর পড়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তখন তারা একে অপরকে বলল, নিজেদের কৃত কিছু সৎকাজের কথা চিন্তা করে বের কর, যা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য তোমরা করেছ এবং তার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র নিকট দো‘আ কর। তাহ’লে হয়ত আল্লাহ তোমাদের উপর হ’তে পাথরটি সরিয়ে দিবেন। তাদের একজন বলতে লাগল, হে আল্লাহ! আমার আব্বা-আম্মা খুব বৃদ্ধ ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট সন্তানও ছিল। আমি তাদের ভরণ-পোষণের জন্য পশু পালন করতাম। সন্ধ্যায় যখন আমি বাড়ি ফিরতাম তখন দুধ দোহন করতাম এবং আমার সন্তানদের আগে আমার আব্বা-আম্মাকে পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে দেরী হয় এবং সন্ধ্যা হওয়ার আগে আসতে পারলাম না। এসে দেখি তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি দুধ দোহন করলাম, যেমন প্রতিদিন দোহন করি। তারপর আমি তাঁদের শিয়রে (দুধ নিয়ে) দাঁড়িয়ে রইলাম। তাদেরকে জাগানো আমি পসন্দ করিনি এবং তাদের আগে আমার বাচ্চাদেরকে পান করানোও সঙ্গত মনে করিনি। অথচ বাচ্চাগুলো দুধের জন্য আমার পায়ের কাছে পড়ে কান্নাকাটি করছিল। এভাবে ভোর হয়ে গেল। হে আল্লাহ! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্যই এ কাজটি করে থাকি তবে আপনি আমাদের হ’তে পাথরটা খানিক সরিয়ে দিন, যাতে আমরা আসমানটা দেখতে পাই। তখন আল্লাহ পাথরটাকে একটু সরিয়ে দিলেন এবং তারা আসমান দেখতে পেল।
দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। পুরুষরা যেমন মহিলাদেরকে ভালবাসে, আমি তাকে তার চেয়েও অধিক ভালবাসতাম। একদিন আমি তার কাছে চেয়ে বসলাম (অর্থাৎ খারাপ কাজ করতে চাইলাম)। কিন্তু তা সে অস্বীকার করল যে পর্যন্ত না আমি তার জন্য একশ’ দিনার নিয়ে আসি। পরে চেষ্টা করে আমি তা যোগাড় করলাম (এবং তার কাছে এলাম)। যখন আমি তার দু’পায়ের মাঝে বসলাম (অর্থাৎ সম্ভোগ করতে তৈরী হলাম) তখন সে বলল, হে আল্লাহ্‌র বান্দা! আল্লাহকে ভয় কর। অন্যায়ভাবে মোহর (পর্দা) ছিঁড়ে দিয়ো না। (অর্থাৎ আমার সতীত্ব নষ্ট করো না)। তখন আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। হে আল্লাহ! আপনি জানেন আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে আপনি আমাদের জন্য পাথরটা সরিয়ে দিন। তখন পাথরটা কিছুটা সরে গেল।
তৃতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ! আমি এক ‘ফারাক’ চাউলের বিনিময়ে একজন শ্রমিক নিযুক্ত করেছিলাম। যখন সে তার কাজ শেষ করল আমাকে বলল, আমার পাওনা দিয়ে দাও। আমি তাকে তার পাওনা দিতে গেলে সে তা নিল না। আমি তা দিয়ে কৃষি কাজ করতে লাগলাম এবং এর দ্বারা অনেক গরু ও তার রাখাল জমা করলাম। বেশ কিছু দিন পর সে আমার কাছে আসল এবং বলল, আল্লাহকে ভয় কর (আমার মজুরী দাও)। আমি বললাম, এই সব গরু ও রাখাল নিয়ে নাও। সে বলল, আল্লাহকে ভয় কর, আমার সাথে ঠাট্টা কর না। আমি বললাম, আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, ঐগুলো নিয়ে নাও। তখন সে তা নিয়ে গেল। হে আল্লাহ! আপনি জানেন, যদি আমি আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে পাথরের বাকীটুকু সরিয়ে দিন। তখন আল্লাহ পাথরটাকে সরিয়ে দিলেন।
{আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রা.) হ’তে বর্ণিত, বুখারী হা/২৩৩৩, ‘চাষাবাদ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৩; মুসলিম হা/২৭৪৩, মিশকাত হা/৪৯৩৮}।
শিক্ষা :
১. বান্দা সুখে-দুঃখে সর্বদা আল্লাহকে ডাকবে।
২. বিপদাপদের সময় আল্লাহকে ব্যতীত কোন মৃত ব্যক্তি বা অন্য কাউকে ডাকা শিরকে আকবর বা বড় শিরক।
৩. সৎ আমলকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।
৪. পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে হবে এবং স্ত্রী ও সন্তানদের উপর তাদেরকে প্রাধান্য দিতে হবে।
৫. শ্রমিককে তার ন্যায্য পাওনা প্রদান করতে হবে।

Source: http://i-onlinemedia.net/archives/2913